আস-সালামু আলাইকুম। SQSF-কাউন্সেলিং সেন্টার এন্ড স্মার্ট লাইব্রেরী (আত্নশুদ্ধির সফটওয়্যার)।

বহু সংসার হারামভাবে চলছে, শুধুমাত্র কাযীদের ভুলের কারণে! কেননা সাধারণ মানুষ তো বিবাহ তালাকের এসব মাসআলা বোঝে না, ফলে কাযীদের ভুল হতে পারে সে চিন্তাও তারা করে না। অপরদিকে কাযীরা বিবাহ তালাকের সঠিক নিয়ম ও সূক্ষ্ম পার্থক্য না জানার কারণে এমন ভুল করে বসে, যার দরুন হারাম সংসার গড়ে ওঠে! তাই সচরাচর যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, নিজে জানুন অপরকেও জানিয়ে দিন।
🔹১। ভুল: বিয়ের আগে কাবিননামাতে স্বাক্ষর করানো!
সংশোধন: রাষ্ট্রীয় আইনে বিয়ের আগে স্বাক্ষর করানোর নিয়ম নেই। বরং বিয়ে পড়ানোর পর কাবিননামায় স্বাক্ষর করাতে হয়। নতুবা স্ত্রী তালাকের অধিকার পায়না, শর্তসমূহ দেবারও কোন কার্যকারিতা থাকে না। ইসলামী নিয়মে এমন। ফলে যদি কখনো সমস্যার কারণে স্ত্রী কাযীর থেকে তালাকে তাফয়ীয নেয়, তাতেও তালাক হয়না। ফলে তাদের বিচ্ছেদ না হওয়াতে অন্যত্র বিয়ে বসাটা হারাম হয়। তাই বিয়ে পড়ানোর পর স্বাক্ষর করুন।
.jpg)
🔸২। ভুল: কোর্টম্যারিজের হলফনামায় স্বাক্ষর করে সংসার!
সংশোধন: কোর্টম্যারিজের হলফনামায় স্বাক্ষর করে কিন্তু মৌখিকভাবে কোন বিয়ে করে নেয়না বা ইজাব কবুল করেনা, এমতাবস্থায় তাদের বিয়ে হয়না। সংসার করা হারাম। কেননা কোর্টম্যারিজের হলফনামা নিছক অঙ্গীকারনামা। এর আইনী কোন ভ্যালু নাই। আর যদি মুখে ইজাব কবুল করেও নেয়, তাহলে সংসার বৈধ হবে কিন্তু স্ত্রী এর দ্বারা তালাকের অধিকার পায়না! ফলে পরবর্তীতে তালাক নিলেও তালাক হয়না। এমন অবস্থায় অন্য বিয়ে বসলে সেটা হারাম হয়ে যায়।
.jpg)
🔹৩। ভুল: কাযীরা স্ত্রীর তালাকের অধিকার আছে কিনা তা খেয়াল না করা!
সংশোধন: স্ত্রী যখন কাযীর কাছে তালাক নিতে যায়, তখন অনেক কাযীরা কাবিননামা আছে কি নাই, নাকি হলফনামাই শুধু আছে, স্বামী বিয়ের আগে নাকি পরে স্বাক্ষর করেছিল, স্ত্রী অধিকার পেয়েছিল কিনা, শর্ত থাকলে তা ভঙ্গ হয়েছে কিনা, এর ফলে স্ত্রী তালাকের অধিকার পেল কিনা— এসবের তোয়াক্কা না করেই কাযী তাফয়ীযের তালাকনামা তৈরী করে দেয়। ফলে স্ত্রীর শরীয়তমোতাবেক অধিকার না থাকায় এটাতে স্ত্রী স্বাক্ষর করার দ্বারা বা স্বামীর কাছে পাঠানোর দ্বারা তালাক হয়না। ফলে স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে বসাও হারাম হয়।
.jpg)
🔸৪। ভুল: তালাকের অধিকার থাকলেও কাযী ভুলশব্দে তালাকনামা তৈরী!
সংশোধন: স্ত্রীর তালাকের অধিকার যদি থাকেও, কিন্তু কাযী তালাকনামায় এমন সব ভুল কথা লেখে বা লেখা থাকে, যার দ্বারা তালাক হয়না! সেগুলো পয়েন্ট আকারে আলোচনা করা হল:
(ক) স্ত্রী নিজ নফসের উপর তালাক নিতে পারে, স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। কিন্তু দেখা যায়, তালাকনামায় লেখা থাকে— “স্বামীকে তালাক দিয়ে বিচ্ছেদ করলাম।” অথচ স্বামীকে তালাক দেবার দ্বারা তালাক হয়না। ফলে স্বামী তাফয়ীয তালাকের কাগজে স্বাক্ষর না করলে বা সম্মতি প্রকাশ না করলে তালাক হবে না। (বাস্তবতা হল- তাফয়ীয তালাকনামাতে স্বামীর স্বাক্ষরের জায়গাই থাকে না) ফলে স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে বসলে তা হারাম।
(খ) কাবিননামাতে তালাকের অধিকারের কোন সংখ্যা দেয়া থাকে না, অথচ তালাকনামায় তিন তালাকের কথা লিখে দেয়া হয়। ফলে যদি একশব্দে তিন তালাক নেবার কথা বলা থাকে, তাহলে বিশুদ্ধমতানুসারে তালাকই হবে না। ফলে অন্যত্র বিয়ে বসা হারাম। তবে স্বামী তালাকনামার তিন তালাকের সম্মতি দিয়ে দিলে তালাক হবে।
(গ) অনেকসময় শর্তযুক্ত অধিকার থাকে, অথচ কোন শর্ত ভঙ্গ না হলেও স্ত্রীকে তালাকনামা তৈরী করে দেয়া হয়। ফলে তালাক হয়না, ফলে অন্যত্র বিয়ে বসা হারাম থাকে। কেননা শর্তভঙ্গ না হওয়াতে স্ত্রী তালাকের অধিকারই পায়নি। তবে স্বামী সে তালাকের ক্ষেত্রে সম্মতি দিলে তালাক হবে।
(ঘ) অনেকসময় স্ত্রী একবার তালাক নিয়েছিল, পরে আবার মিলিত হয়েছিল রজয়ী তালাক হবার কারণে ফেরার সুযোগ ছিল তাই। পরবর্তীতে আবার স্ত্রী তালাকনামা তৈরী করতে যায়। কাযী আবার তালাকনামা তৈরী করে দেয়াটা ভুল। কেননা কাবিননামার এমন অধিকার যদি দেয়া থাকে যার দ্বারা একবারই অধিকার পেয়েছে, তাহলে দ্বিতীয়বার তালাক নেবার দ্বারা তালাক হবে না। ফলে অন্যত্র বিয়ে বসা হারাম হবে। খুব কম সংখ্যক কাবিননামাতে তালাকের অধিকার বারবার নেবার পদ্ধতির অধিকার দেয়া থাকে।
(ঙ) অনেকসময় রজয়ী তালাকের অধিকার দেয়া থাকে, ফলে তালাকনামাতে বায়েন তালাক নিয়ে থাকে স্ত্রী। ফলে তা রজয়ীই হয়ে থাকে। স্বামী ইদ্দতের ভেতরে মুখে ফিরিয়ে নিলেই ফেরানো হয়ে যায়। অথচ স্ত্রীরা মনে করে যে ফেরানো হয়নি, তাই তারা অন্যত্র বিয়ে বসে যায়। ফলে হারাম সংসার তৈরী হয়।
.jpg)
⚠️ সতর্কতা: স্ত্রীর তালাকের অধিকার প্রাপ্ত না হলে তাফয়ীযের দ্বারা বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে খুলা করার দ্বারা বিচ্ছেদ ঘটানো যাবে। সেক্ষেত্রে স্বামী স্বাক্ষর বা মৌখিক সম্মতি দিলেই তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। তালাকের অধিকার থাকলেও সঠিক শব্দ প্রয়োগে তালাকনামা তৈরী করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞ মুফতির সাথে পরামর্শ করে নেবেন।
🔹৫। ভুল: স্বামীরা তালাকনামা তৈরী করতে চাইলে কাযীরা তিন তালাক বলানো বা লেখা!
সংশোধন: স্বামীরা তালাকনামা তৈরী করতে চাইলে কাযীরা তিন তালাক বলান বা তিন তালাক লিখে দেন। এটা ভুল। কেননা একসাথে তিন তালাক দেয়াটা গুনাহ ও রাসূলের ﷺ ক্রোধের কারণ। এতে তিন তালাকই হয়ে যায়! ফলে স্বামী স্ত্রী আবার সংসার করতে চাইলে “শরঈ হালালা” ব্যতীত সে সুযোগ আর থাকে না। তারপরও তারা বিয়ে করে সংসার করার ফলে হারাম ব্যভিচারের সংসার তৈরী হয়।
তাই কাযীদের উচিৎ কেউ তালাক দিতে চাইলে “এক তালাকে বায়েন দিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম” এমনটা লেখা। মুখে বলাতে চাইলে এক তালাকে বায়েন বলানো। ফলে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। ফলে ইদ্দতের পর স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে বসতে পারবে। অথবা আবার কখনো তারা সংসার করতে চাইলে “শরঈ হালালা” ছাড়াই নিজেরা বিয়ে করে নিতে পারবে।
⚠️ সতর্কতা: এক্ষেত্রে স্বামী কখনো তালাক মুখে দিয়েছিল কিনা জেনে নিন। ফলে তাকে মাসআলা বলে দিন। তালাকনামা প্রস্তুতের পূর্বে বিজ্ঞ মুফতির শরণাপন্ন হোন।
🔸৬। ভুল: ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর!
সংশোধন: তালাক কার্যকর আর তালাক রেজিস্ট্রেশন দুটো ভিন্ন জিনিস, অথচ অনেকে তা গুলিয়ে ফেলেন। তেমনি তালাক কার্যকর ও ইদ্দতকেও গুলিয়ে ফেলেন।
মূলতঃ স্বামী যখন তালাক বলে বা তালাকনামাতে স্বাক্ষর করে তখনই তালাক হয়ে যায়। কিন্তু ৯০ দিন পর সে তালাক রেজিষ্ট্রেশন করা হয়। যদিও রাষ্ট্রীয় আইনে তালাক রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক না, এর কোন শাস্তি জরিমানাও আইনে নেই।
৯০ দিনের টার্মটা মূলত ইদ্দতের টার্ম। বলা হয় ৯০ দিন পর অন্যত্র বিয়ে বসতে পারবে। তাই তালাক কার্যকর হয় এমন বলা হয়।
কিন্তু এটা ভুল। কেননা, ইদ্দত সবার ক্ষেত্রে ৯০ দিন না। বরং যাদের লাইফে এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি ও যাদের বার্ধক্যের কারণে চিরদিনের জন্য ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের জন্য ৯০ দিন ইদ্দত। আর কেউ গর্ভবতী হলে গর্ভপ্রসব পর্যন্ত ইদ্দত (এটা রাষ্ট্রীয় আইনেও লেখা আছে), কারো হায়েয বা ঋতুস্রাবস্রাব হলে (হোক তা নিয়মিত বা অনিয়মিত) ইদ্দত হল তিন হায়েয বা তিনটি ঋতুস্রাব। প্রতিটি হায়েয কমপক্ষে ৭২ ঘন্টার কমে শেষ হতে পারবে না এমন।
এ ইদ্দতের ভেতর অন্যত্র বিয়ে বসা যায়না। এটা হল শোকের সময়। তালাক তো আগেই হয়ে গেছে, যদি তালাকই না হতো তাহলে শোক আসবে কিভাবে?
এসব বিষয় ক্লিয়ার করে কাযীকে বলা উচিৎ।
এখানে ব্যসিক কিছু ধারণা দেয়া হল। তাই কাযীরা সতর্ক থাকুন। আর সাধারণ লোকেরা বিবাহ তালাকের পূর্বে বিজ্ঞ মুফতির শরণাপন্ন হয়ে বিস্তারিত বুঝে নিবেন, প্রয়োজনে তাদের তত্বাবধানে কাজগুলো করে নেবেন।
✅ আমাদের “মারকাযুল বাইয়্যিনাত ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার [ফতোয়াবোর্ড ও সালিশ বিভাগ] থেকেও পরামর্শ করে নিতে পারেন অথবা সহীহভাবে বিয়ে তালাক সম্পাদন করিয়ে নিতে পারেন আমাদের মাধ্যমে।
.jpg)
📌
মুফতি রাকিবুল ইসলাম হোযায়ফী
প্রধান মুফতি (Jurisconsult) ও পরিচালক,
মারকাযুল বাইয়্যিনাত ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার
দাওরা ও ইফতা, দারুল ঊলূম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম
জাস্টিস কোর্স (Online), ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা
Notice Board
Follow us @Facebook
Downloads
Useful Links
Visitor Info